সুনামগঞ্জ, ট্যাঙ্গুয়ার হাওড়, নিলাদ্রি লেক ভ্রমণ...

যেভাবে যেতে পারেনঃ ঢাকা থেকে এনা, শ্যামলী, হানিফ বাসগুলো সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া ৫৫০ টাকা জনপ্রতি। আমরা এনা ট্রান্সপোর্টের বাস করে গিয়েছিলাম। রাত ১০ঃ০০ টায়া আমাদের বাস ছাড়ার কথা থাকলেও আমাদের একজন অফিস শেষ করে আসতে আসতে দেরি করে ফেলে। তাই তার জন্য আধাঘন্টার অপেক্ষা। সৌভাগ্যচক্রে বাসে সবাই ছিল আমাদের মত ট্যুরিস্ট। তাই দেরি নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। অবশেষে সাড়ে দশটার পরে মহাখালি থেকে বাস ছাড়ল... মহাখালিতে অনেকগুলো এনা ট্রান্সপোর্টের কাউন্টার আছে তবে সুনামগঞ্জের বাস কিন্তু মেইন টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যায়। উত্তরা, টংগি'তে অনেক জ্যাম ছিল সেখানেই প্রায় ঘন্টাখানেক পার...

রাত তিনটার দিকে শায়েস্তাগঞ্জের আশেপাশে "হোটেল হাইওয়ে ইন" এ যাত্রা বিরতি দেয় ২০/২৫ মিনিট। চাইলে আপনি ফ্রেশ হয়ে হালকা নাশতা করে নিতে পারেন। 





আমরা সকাল ৭ঃ০০ টার দিকে সুনামগঞ্জে পৌছালাম। সেখানে এনা কাউন্টার থেকে ফেরার টিকিট কেটে নিলাম যদিও এক সপ্তাহ আগে বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম ফোনে। এই ফাঁকে মোবাইলে কিছুক্ষণ চার্য দিয়ে নিলাম কাউন্টার থেকেই।

সকালের নাশতা+টয়লেটঃ  এনা কাউন্টারের ঠিক উল্টাপাশেই "পানসি" রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টের যাত্রা বেশিদিন হয়নি তবে তাদের সার্ভিসের কারনে লোক সমাগম যথেষ্ট। যেহেতু বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন রেস্টুরেন্ট সেহেতু তারা যাত্রীদের কথা মাথায় রেখেই কয়েকটা টয়লেট এবং প্রস্রাবখানা তৈরি করেছে। মেয়েদের জন্যও রয়েছে আলাদা ওয়াশরুম। 

আমরা এই রেসুরেন্টেই দাঁত ব্রাশ করে ফ্রেশ হয়ে সকালের নাশতা সেরে নিই। আপনি চাইলে এখানেও মোবাইলে কিছুক্ষণ চার্য দিয়ে নিতে পারবেন। 

চা, নাশতা শেষ করে চাইলে "পানসি পান দোকান" থেকে পানও খেতে পারেন।




ট্যাঙ্গুয়ার হাওড়ে যাওয়ার পালাঃ পানসি রেস্টুরেন্টের সামনে থেকেই লেগুনা পেয়ে যাবেন, যেটা সুরমা ব্রীজ পর্যন্ত যায়। আপনি সুরমা ব্রীজের উপরেই লেগুনা, সিএনজি কিংবা মটরসাইকেল পেয়ে যাবেন যেগুলো তাহিরপুর পর্যন্ত যায়। তবে এই বর্ষা মৌসুমে আর সম্প্রতিক পাহাড়ে ঢলে সৃষ্ট বন্যার কারনে সড়কপথে সরাসরি তাহিরপুর যাওয়ার উপায় ছিলনা।  রাস্তা এবং ব্রীজ পানিতে ডুবে যাওয়ার কারনে আমাদের বিশ্বম্ভরপুর পর্যন্ত যেতে হয়েছিল, সেখানথেকে নৌকা পার হয়ে ওপার থেকে আবার সি এন জি / লেগুনা পাওয়া যায় তাহিরপুর পর্যন্ত। সুরমা ব্রীজ থেকে আমরা আমাদের সাতজনের জন্য দুইটা সি এন জি ঠিক করি ১,০০০ টাকা দিয়ে। ভাড়া আরো বেশি চাইছিল কারন পথের যায়গায় যায়গায় রাস্তা ডুবে গিয়েছিল। আমাদেরকে নেমে হেঁটে পার হতে হয়েছিল কয়েকবার। যদিও একদিন পরে সেই রাস্তা দিয়ে আসার সময় দেখি পানি নেমে গিয়েছিল। 






তবে দুর্ভাগ্যচক্রে আমাদের মাহফুজের চশমাটা এখানে পড়ে পানির স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে এক মুহুর্তেই।  

যেহেতু আমাদের নৌকা আগেই ঠিক করা ছিল এবং নৌকার মাঝিই আমাদেরকে ফোনে ডিরেকশন দিয়ে দিচ্ছিল যে কোথায় আসলে আমাদের জন্য সহজ হবে তাই আমাদের খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি (ঐ একই নৌকা গতবছরেও ব্যবহার করেছিল আমাদের গ্রুপ) । আপনি চাইলে ঘাটে ভেড়ানো নৌকা দেখেও পছন্দ করে ভাড়া নিতে পারেন। দরদাম অবশ্যই ঠিক করে নিবেন, কতক্ষণের জন্য নিচ্ছেন সেটাও জানিয়ে রাখুন। আমরা ১ দিনের (পুরো ২৪ ঘন্টাই হয়েছিল) জন্য নিয়েছিলাম, আর আমাদের নৌকা সাইজে ছোট ছিল, কোনমতে আমাদের সাতজনের জন্য...। আমরা পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া দিয়েছিলাম। তবে নৌকার সাইজ বড় হলে ভাড়াও সেভাবে বেড়ে যায়। ১৫ জনের উপরে হলে নৌকার ভাড়া প্রায় ১২-১৫ হাজারের মধ্যে পড়তে পারে। তবে অবশ্যই কয়েকটা নৌকা দেখে যাচাই বাছাই করে তারপরে ঠিক করবেন।  টয়লেট কয়টা, কমোড ঠিকমতো আছে কিনা সেটাও দেখে নিবেন। অনেক নৌকার ভিতরে রান্নার ব্যবস্থাও আছে। আপনারা যদি নিজেরা রান্না করে খেতে চান তাহলে অবশ্যই সেরকম দেখে নৌকা নিবেন আর চাল, ডাল, তরিতরকারি সব আগে থেকেই কিনে নিবেন।

আমাদের নৌকার মাঝির নাম ছিল মুহিবুর। যদি কারো প্রয়োজন হয় যোগাযোগ করে নিতে পারেন। তার দুটো নৌকা আছে একটা নৌকা বড় (১০/১৫ জনের জন্য), তবে আমরা যেটাই গিয়েছিলাম সেটা ছোট ছিল আর মান ভাল তেমন ভাল ছিলনা। চাইলে তার সাথে যোগাযোগ করে অন্য নৌকার খবরও হয়ত নেওয়া যেতে পারে। তার ফোন নংঃ  01742495989।

নৌকায় উঠার মূহুর্তের কিছু ছবিঃ 






নৌকায় উঠে আমরা প্রথমে তাহিরপুর বাজারে যায়। বাজারে যেয়ে দেখি সেখানেও কোমর পানি। আমাদের কলিগ আলি আকবর আর তার মামা দুজনে ঐ পানির মধ্যে নেমে বাজার থেকে বিস্কুট, পানি আর খেলার জন্য একটা রাবারের ফুটবল কিনে আনে। যদি নৌকার রান্না করে খেতে চান তবে চাইলে এই বাজার থেকেও প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল... কিনে নিতে পারেন। আর হ্যা,  কিছু নাশতাও সাথে নিতে ভুলবেন না। 



তাহিরপুর বাজার থেকে কেনাকাটা সেরে আমরা ওয়াচ টাওয়ারের দিকে যায়। সেখানে কিছুক্ষণ খেলা করি, তারপর গোসল আর ফটোসেশন... 
বিঃ দ্রঃ এই সময়ে ওয়াচ টাওয়ারের ঐখানে পানির গভীরতা কম করে হলেও ১০ ফুট। তাই সাঁতার না জানলে পানিতে নামবেন না। আর হ্যা, সাঁতার জানলেও পানিতে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরে নিবেন। নৌকা ঠিক করার সময়েই জেনে নিবেন যে নৌকায় লাইফ জ্যাকেট আছে কিনা। না থাকলে তারা তাহিরপুর বাজার থেকে নিয়ে নেয়। তাই এই বিষয়টা অবশ্যই মাথায় রাখবেন।

00. Tabguar Haor Watchtower Live-Video-00
01. Tanguar Haor WatchTower Live Video-01
02. Tanguar Haor Watchtower Live Video-02







এখান থেকে গোসল সেরে তারপর টেকেরঘাটের দিকে যাত্রা। ওটাই আমাদের গন্তব্য ছিল। প্রায় দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে আমরা ট্যাকেরঘাটে পৌছায়। আসার পথেই আমরা এক রেস্টুরেন্টে ফোন দিয়ে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিই। আমরা পাঁচ বন্ধু রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া সারি। এদের রান্না যথেষ্ট ভাল। আর এখানে আপনি হাঁসের মাংস, রাজ হাঁসের মাংস, টাকি মাছের ভর্তা, বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তা, মুরগির মাংস সহ আরো কয়েক রকমের খাবার পাবেন। খাওয়া শেষে চাইলে পাশের দোকান থেকে দই আনিয়ে খেতে পারেন। হোমমেইড দই, স্বাদ যথেষ্ট ভাল। ওহ! আরেকটা বিষয়, নৌকার মাঝিদের খাবার কিন্তু আপনাদের খরচে... যদি তাদেরকে খাওয়াতে না চান তবে তাদেরকে ভাড়ার সময় সেটা বলে নেওয়া ভাল। 

আমরা খাওয়া দাওয়া শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে পাশে ঝর্ণা, নিলাদ্রি লেক দেখতে গিয়েছিলাম। পাশেই পাহাড় আর পাহাড়ে উপরে ভারতের সীমানা। আমরা যেহেতু বৃষ্টির মধ্যে গিয়েছিলাম সেহেতু মানুষের ভীড় ছিলনা বললেই চলে। তবে ব্রিষ্টির মধ্যে পাহাড়, ঝর্ণা, লেক আর সবুজ ঘাস দেখার মজাই আলাদা। 












আপনি চাইলে ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে নৌকায় করে নিলাদ্রি লেক ঘুরতে পারেন, ভারতের সীমানা ঘুরে আসতে পারেন। 
বৃষ্টির কারনে আমাদের ঘোরাঘুরি এই পর্যন্তই ছিল। পরদিন সকালেও অনেক বৃষ্টি ছিল তাই আর ঘোরাঘুরি না করে ফিরতি যাত্রা শুরু করি কারন দুপুর ২ঃ৩০ মিনিটে আমাদের বাসের টিকিট কাটা ছিল। তবে সকালের দৃশ্যগুলো অনেক সুন্দর ছিল। ঐ পাহাড়ে মেঘের রাজত্ব যেন মিনি সাজেক... 






Comments

Popular posts from this blog

Obesity and Diabetes